মোঃ ফেরদাউস::বাংলাদেশের জনজীবনে নতুন আতঙ্কের নাম মব সন্ত্রাস। দেশে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে মব সন্ত্রাসের কারণে প্রাণ গেছে ১৮৪ জনের। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এসব ঘটনা ঘিরে সমাজমাধ্যমসহ পত্রপত্রিকায় ‘মব’ ও ‘মব জাস্টিস’ শব্দ দুটি আলোচনায় রয়েছে। ইংরেজি শব্দ ‘মব’-এর অর্থ ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা। আর সরল ভাষায়, এ বিশৃঙ্খল জনতা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে সহিংসতা করলে তাকে ‘মব জাস্টিস’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার’ বলে।বিচার ছাড়াই প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা, লাশ পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা চরমভাবে নাজেহাল করার ঘটনাগুলো প্রশ্ন তুলছে- এ রক্তক্ষয়ী সহিংসতার দায় কার? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাস সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার-সংক্রান্ত বৈশ্বিক ঘোষণা অনুযায়ী, মব সন্ত্রাসের কারণে মানবাধিকারের বড় লঙ্ঘন হয়। ঘোষণার ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে সবার সমতার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আর ঘোষণার ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার- তাঁকে যেন নিরপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে বিচারের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ গত বছরের ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ৪৯ জেলায় হামলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১ হাজার ৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত জানুয়ারির মাঝামাঝি পুলিশের অনুসন্ধানের বরাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলে, ৪ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ১ হাজার ৪১৫টি অভিযোগের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। আর ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রদায়িক কারণে।প্রথম দিকে অনেকেই মব সন্ত্রাসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছেন। কেউ কেউ এটাকে প্রতিবাদের ভাষা কিংবা ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে করছিলেন। এজন্য মব দমনে সরকারের মধ্যে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। জাগ্রত খবরের অনুসন্ধানে এরকম অন্তত ১৬৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে, যেখানে দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে মব সন্ত্রাস চলেছে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এসব মব যারা করেছেন তারা বেশির ভাগই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে কারণেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে একশন নেওয়া সম্ভব ছিল না। এরকম অন্তত ২৬টি ঘটনা আছে, যেখানে দীর্ঘ সময় মব চালানো হয়েছে। পুলিশ উল্টো মবকারীদের নিরাপত্তা দিয়েছে।মবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ হলো, পুলিশের ভয় এবং মনোবলের অভাব। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাঁচ আগস্টের পর প্রথম মবের শিকার হয় বাংলাদেশের থানাগুলো। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ও তার পরদিন রাজধানীর বিভিন্ন থানা থেকে ১ হাজার ৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছে বা খোয়া গেছে। ওই সময়ে থানা ভবন, ফাঁড়িসহ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ১৪২টি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে ১৮১টি গাড়ি। ডিএমপির আওতাধীন থানার সংখ্যা ৫০। ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুর থানা। তিনটি থানা ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব থানা থেকে অস্ত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।