
::দেশের অর্থনৈতিক দুর্যোগ যেন কাটছেই না। বিনিয়োগের কোনো সুখবর নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক দুর্যোগে পড়তে যাচ্ছে দেশ। বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে গত প্রায় ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দুর্দশায় দেশের আর্থিক খাত। দুর্দশার মাত্রা কতটা তা বোঝাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে বলেছিলেন, দেশের আর্থিক খাতের অবস্থা পাকিস্তানের চেয়েও খারাপ। সেই দুর্দশা থেকে টেনে তুলতে যে রকম পরিকল্পনা দরকার ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তা এখনো করতে পারেননি। যে কারণে দেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে। কোনোভাবেই যেন এতে স্বস্তি ফেরানো যাচ্ছে না।বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার ও রফতানি-রাজস্বে মন্দা অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে; অথচ প্রত্যাশিত নির্বাচনের আগেই অর্থনৈতিক দুর্যোগ পড়ে যাচ্ছে দেশ। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে কৃষক-শ্রমিক ভাল নেই। এমনকি উচ্চ শিক্ষার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রতিযোগিতা হতো; সেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্ধেক সিট খালি। আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নিতে ভর্তি হতে পারছেন না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৪৭ কোটি ডলার। অবশ্য বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিশেষ কোন পদক্ষেপও চোখে পড়েনি। এমনকি দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাকখাতে গত এক বছরে দেশে ২৫৮টি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কয়েক লাখ শ্রমিক কর্ম হারিয়েছেন। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যা তুলে ধরতে চার মাস ধরে সময় চেয়েও সাক্ষাৎ পাননি বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। অথচ পোশাকখাতে বাংলাদেশ ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে চীন ও ভারতের উপর আরোপিত অতি শুল্কের কারনে যে সুবিধা পাচ্ছিল তা ইতোমধ্যে কমে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে এক বছরের জন্য বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। এতে চীনের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৭ শতাংশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চীন-মার্কিন বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যে দ্বিগুণ শুল্ক, রফতানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাও ধীরে ধীরে ফিঁকে হয়ে যাচ্ছে। কারণ ইতোমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, ভারতের সঙ্গে শিগগরিই একটি বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে। একই সঙ্গে শুল্ক উত্তেজনার মধ্যেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছরের জন্য প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রফতানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক এবং ২৫ শতাংশ জরিমানা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যে দেশে সুদের হার বেশি সেই দেশে বিনিয়োগ হয়। বাংলাদেশের সুদহার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশের চেয়ে বেশি হলেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে না। সুতরাং সুদহার নয়, মূল কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করা কাজ করছে। কারণ যে দেশে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি সেই দেশের বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মুনাফা পায় না বলেই বিনিয়োগ করতে আর আগ্রহী হয় না।বিশ্লেষকরা বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি কেবল শূন্য দশমিক ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, যা করোনার সময়েরও কম। কয়েক বছর আগে মহামারীর কারণে শিল্প ও অফিস থমকে গিয়েছিল, সেই সময় বিনিয়োগ বৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে, কর্মযজ্ঞ থেমে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি না থাকলেও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি আরো কম হয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম ও জ্বালানি সংকট উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ কমাচ্ছে।