রিয়াজ আহম্মেদ::রাজধানীর বকশীবাজারে ছোট্ট একটি পার্ক, যা হতে পারত স্থানীয় শিশুদের প্রাণের জায়গা, বয়স্কদের জন্য হাঁটার একমাত্র পরিসর। কিন্তু এখন সেটিই পরিণত হয়েছে একটি জীর্ণ, অপরিচ্ছন্ন ও অনিরাপদ স্থানে। অব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে পার্কটি এখন দখলে নিয়েছে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাং। সন্ধ্যার পর এটি হয়ে ওঠে মাদকসেবীদের নিরাপদ স্থান।এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবহেলা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ডিএসসিসির অঞ্চল-৩ এর আওতাধীন ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বকশীবাজার পার্ক।২০২০ সালে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে বকশীবাজার পার্ক সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু পাঁচ বছর অতিক্রম করেও পার্কটির উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হয়নি। এটি এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সন্ধ্যার পর বন্ধ গেটের বেড়া টপকে পার্কে আড্ডা জমায় মাদকসেবী ও বহিরাগতরা। সিটি করপোরেশনের নজরদারির অভাবে বকশীবাজার পার্ক আজ পরিণত হয়েছে একটি বিপন্ন ও অনিরাপদ এলাকায়।সরেজমিন দেখা গেছে, বকশীবাজার পার্কে প্রবেশের মুহূর্তেই চোখে পড়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার চিহ্ন ভাঙাচোরা রাইড, মরিচা ধরা দোলনা, ও ঘনজঙ্গল। হাঁটার কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, চারদিকে শুধু আগাছা আর আবর্জনার স্তূপ। এক পাশে একটি স্লাইড পুরোপুরি ভেঙে পড়ে আছে, যা শুধু ব্যবহারের অনুপযুক্তই নয়। পার্কে স্থাপিত রঙিন রাইডগুলো এখন আর শিশুর হাসির উৎস নয়, বরং ধুলা-ময়লার নিচে হারিয়ে যাওয়া অবহেলার নিদর্শন। পার্কের ভেতরে কোথাও কোথাও পানি জমে আছে। সেই পানিতে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য মশা। পার্কের পেছনের দিকে একটুখানি এগোলেই দেখা যায় দেওয়াল ঘেঁষে কিছু ভাঙা বোতল ও সিগারেটের খোসা। সব মিলিয়ে স্পষ্ট এটি আর কোনো শিশুদের খেলার জায়গা নয়। বরং সন্ধ্যার পর এটি হয়ে ওঠে মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা। সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চগুলো ভাঙা ও শ্যাওলা পড়ে গেছে। কোথাও শুধু কাঠ বা লোহার ফ্রেম পড়ে আছে। বসার অযোগ্য। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। লাইট নষ্ট থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়। পার্কে পরিবার নিয়ে কেউ আসার কল্পনাও করতে পারে না।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পার্কটি কোনো সাধারণ ফাঁকা জমি নয়, এটি ২০২০ সালে শুরু হওয়া একটি সরকারি প্রকল্প, যেখানে বাউন্ডারি ঘেরা প্রায় সব অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছিল। অথচ সেটিই এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে।পার্কের পাশের বাসিন্দা অরণ্য যুগান্তরকে বলেন, বকশীবাজার এলাকায় এটি একমাত্র পার্ক, অথচ এটি এখন দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ঢাকা শহরের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা এটি। আমার আড়াই বছরের একটি সন্তান আছে। সারা দিনের কাজ শেষে তাকে নিয়ে একটু হাঁটতে বেরোই; কিন্তু এই পার্কের অবস্থা দেখে আর নামতে ইচ্ছা করে না। পার্কের লাইটগুলো অনেক আগেই ভেঙে গেছে, সন্ধ্যার পর চারপাশে শুধু অন্ধকার। পার্কের ভেতর বড় বড় গাছপালা ও আগাছা এতটাই বেড়ে উঠেছে যে চারপাশে জঙ্গলের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বর্ষায় এসব গাছের নিচে পানি জমে থাকায় মশার ভয়াবহ উপদ্রব দেখা দেয়। আশপাশের বাসিন্দারা মশার যন্ত্রণায় টিকে থাকতে পারে না। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, গত বছরের জুলাই মাসে আন্দোলনের পর থেকে সিটি করপোরেশনের কোনো তদারকি নেই।সুলতানুল উলূম মাদ্রাসার শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে ডিএসসিসি পার্কটিতে রাইড, লাইট ও গাছসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছিল। এরপর হঠাৎ পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। মশার উপদ্রবে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা রাতে ভালো ঘুমাতে পারছেন না।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বকশীবাজার মাঠ সংলগ্ন সরকারি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে-৫ এর সিকিউরিটি গার্ড মো. আব্দুল লতিফ যুগান্তরকে বলেন, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গেট খোলা থাকে, এরপর গেট লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খাইরুল বাকেরের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ ও হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।