
বিশেষ প্রতিবেদক::সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোমবার দিনভর তিনটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গুজবের মধ্যে ছিল-দেশে জরুরি অবস্থা জারি হচ্ছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে বাদ দিয়ে গঠন করা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আবার কেউ কেউ গুজবের মাত্রা বাড়িয়ে বলেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। রোববার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এবং সোমবার রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে এসব গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আবার গুজবে ভর করে ইউটিউব ও ফেসবুকে অনেকে নানারকম শঙ্কার কথা ও যুক্তি তুলে ধরে বিভিন্ন বিশ্লেষণের কনটেন্ট তৈরি করেন। ফলে রোববার রাত থেকে শুরু হয়ে সোমবার দিনভর জনমনে সংশয়, সন্দেহসহ নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভর করে।এদিকে গুজবের এই চাপ থেকে গণমাধ্যমও বাদ যায়নি। সমাজের বিভিন্ন স্থান থেকে সংবাদপত্র অফিস ও টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মীদের কাছে ফোন আসতে থাকে। যেখানে বেশির ভাগ ব্যক্তির জানার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি প্রশ্ন। এর মধ্যে কী হতে যাচ্ছে দেশে, কখনো জরুরি অবস্থা জারি হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকার থাকতে পারবে কিনা? গুজবের এমন উত্তাপের খবর ততক্ষণে সচিবালয়সহ প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরেও পৌঁছে যায়। এরপর জনমনে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা দূর করতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এবং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, গুজব-গুঞ্জন নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। জরুরি অবস্থা কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কোনো আশঙ্কার ব্যাপারে তিনি অবগত নন।এদিকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, জেনারেল ওয়াকার আশ্বস্ত করেছেন, ‘সরকারের সব উদ্যোগ ও কর্মসূচিকে সফল করতে সেনাবাহিনী অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সময়ে গুজবের প্রতি গুরুত্ব না দিতে প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন তিনি। অপরদিকে আইএসপিআর থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাপ্রধান বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে তার গুলশানের বাসভবনে রোববার দেখা করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এরপর সোমবার সকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। তার এই দেখা করা নিয়ে উল্লিখিত গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশজুড়ে জনমনে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটি জানতে যে যার মতো নানা মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে।এদিকে দুপুর না গড়াতেই এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়ে খবর আসে ডাকসুর নির্বাচন স্থগিত করেছেন উচ্চ আদালত। এ খবর শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এরপর গুজবের পালে আরও জোরেশোরে বাতাস লাগে। তবে বিকাল নাগাদ দুই বিবৃতি সামনে এলে জনমনে অনেকটা স্বস্তি ফিরে আসে। এর পরপরই খবর আসে চেম্বার জজ আদালত ডাকসু নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের আদেশও স্থগিত করেছেন। ফলে সন্ধ্যা নাগাদ গুজবের বিভ্রান্তি কেটে যায়।প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিবৃতি : গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সোমবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সেনাবাহিনীর সহায়তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর অব্যাহত অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। এই ভূমিকা আরও সুসংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন ড. ইউনূস। এর মধ্যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী মাসগুলোতে সব বাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি এমন একটি নির্বাচন দেওয়ার জন্য জাতির কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছি, যেখানে বেশ কিছু বিষয় থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে-ভোটার উপস্থিতি, নতুন ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে বৈশ্বিক আস্থা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন এবং উৎসবমুখর পরিবেশের দিক থেকে অনন্য হবে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, চারদিকে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এসব গুজবের প্রতি গুরুত্ব না দিতে প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন। সেনাপ্রধান বলেন, ‘সরকারের সব উদ্যোগ ও কর্মসূচিকে সফল করে তোলার জন্য তার পুরো বাহিনী অঙ্গীকারবদ্ধ। এছাড়া বিবৃতির এক স্থানে সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।আইএসপিআরের বিবৃতি : গণমাধ্যমে পাঠানো এ সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সোমবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। প্রথমে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা এবং পরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সাক্ষাৎকালে সেনাপ্রধান সম্প্রতি তার চীন সফরকালীন অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকের অভিজ্ঞতা ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং তা উন্নয়নে তার বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। আলোচনায় জেনারেল ওয়াকার আশ্বস্ত করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। এছাড়া বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চলমান উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন সেনাপ্রধান।যা বললেন আইন উপদেষ্টা : আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সেনাপ্রধান দেখা করেছেন-এ ধরনের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। আমি দু-একটি পত্রিকায় দেখেছি। অনলাইনে এ বিষয়টি নিয়ে নানান গুজব-গুঞ্জন হচ্ছে দেখেছি। এসব গুজব-গুঞ্জন নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। এটি হচ্ছে আমার বক্তব্য। এটা কি তাহলে গুজব সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন- ‘এখন পর্যন্ত তো অবশ্যই গুজব। আমি তো এখন পর্যন্ত কিছু জানি না। সেনাপ্রধান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও আগে দেখা করেছেন। আমি মনে করি না, এতে বিচলিত হওয়ার মতো কিছু আছে।আইন উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন ছিল, জরুরি অবস্থা কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মতো কিছু হচ্ছে কিনা। জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি এ ধরনের কোনো আশঙ্কার ব্যাপারে অবগত নই।’ আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘সরকার ঘোষিত সময়ে অর্থাৎ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবে। নির্বাচন পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।’ আসিফ নজরুলের কাছে প্রশ্ন ছিল, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। কিন্তু এনসিপিসহ কয়েকটি দল বলছে, সংস্কার এবং বিচারের পর নির্বাচন। জবাবে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোর বিচার-বিবেচনাবোধের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ, মতানৈক্য, ভুল বোঝাবুঝি আছে। আবার তারা জাতীয় প্রয়োজনে এক হয়। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিরোধ হয়েছে। আবার মতবিরোধ শেষও হয়েছে।তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে অবশ্যই তাদের মধ্যে ঐক্য দেখতে পারব এটা আমরা প্রত্যাশা করি। আসিফ নজরুল বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিষয়ে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশনকে সে রকম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওনারা সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার মতে, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য শেষ পর্যন্ত থাকলে সময়মতো নির্বাচন সম্ভব কিনা এ প্রশ্নে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা তো দলগুলোর ব্যাপার। সরকারের অবস্থান হলো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।এনসিপি চাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচন হোক-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটা তো এনসিপির দলীয় বক্তব্য। তাদের দলীয় বক্তব্য নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। আমি যেটা বললাম সেটা সরকারের বক্তব্য।