
গণভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ : বাংলাদেশের সংবিধান ইতিহাসে গণভোটের নজির খুবই সীমিত। সাধারণত সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। ফলে জনগণের সরাসরি মতামত ছাড়াই বহু মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধও হয়েছে। এই বাস্তবতায় গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রশ্নে জনগণের সম্মতি নেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ভোটারদের সামনে চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা হবে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আপনি সম্মত কি না? উত্তরে থাকবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। যদিও ব্যালটে বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত, বাস্তবে এগুলোর ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব, যেগুলো রাষ্ট্রের কাঠামোকে আমূল বদলে দিতে পারে।
সংস্কারের পটভূমি: অভ্যুত্থান থেকে ঐকমত্য : ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য, নিপীড়ন ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদের বিস্ফোরণ। এর ফলেই ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার শুরু থেকেই ঘোষণা দেয়—রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যেই গঠিত হয় সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনসহ একাধিক কমিশন। এসব কমিশনের সুপারিশ থেকে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে একমত হয়, যেগুলো নিয়ে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত।

হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে: তিন স্তরের বাস্তবায়ন : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া হবে তিন ধাপে। প্রথমত, ইতোমধ্যে জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ আইনি ভিত্তি হিসেবে কার্যকর থাকবে। দ্বিতীয়ত, গণভোটের মাধ্যমে এই আদেশ ও সংবিধান–সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের বৈধতা পাবে। তৃতীয়ত, নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। এই পরিষদ একই সঙ্গে সংসদ ও সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেই জুলাই সনদের সব প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে না। প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে পরিষদে আলোচনা, বিতর্ক ও ভোট হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সম্মতিতেই কোনো প্রস্তাব গৃহীত হবে। অর্থাৎ সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সংস্কার চূড়ান্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা: একচ্ছত্রতা থেকে ভারসাম্যে : বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত নির্বাহী ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো এই ক্ষমতার কাঠামোতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ আলাদা করার কথাও বলা হয়েছে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বাড়বে।রাষ্ট্রপতির ভূমিকা: প্রতীকী থেকে কার্যকর : জুলাই সনদে কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে স্বতন্ত্র এখতিয়ার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কিছুটা হলেও প্রতীকী সীমা ছাড়িয়ে কার্যকর রূপ পেতে পারে।
দ্বিকক্ষ সংসদ ও এমপিদের স্বাধীনতা : সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। নিম্নকক্ষের পাশাপাশি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠিত উচ্চকক্ষ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনে ভারসাম্য আনবে। সংবিধান সংশোধনে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন লাগবে—ফলে কোনো একটি দলের একক সিদ্ধান্তে সংবিধান পরিবর্তন কঠিন হবে। এ ছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন—যা সংসদে প্রকৃত বিতর্ক ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দর্শন : জুলাই সনদে সংবিধানের মূলনীতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমান চার মূলনীতির পরিবর্তে প্রস্তাবিত মূলনীতি হলো—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। পাশাপাশি মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। নাগরিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে—‘বাঙালি’ পরিচয়ের পাশাপাশি ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকবে, তবে অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতিও নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
নারী ও নাগরিকের দৃষ্টিতে সংস্কার : একজন নারী নাগরিক হিসেবে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে আমি দেখি সম্ভাবনার আলোকে, তবে অন্ধ সমর্থন নয়—সমালোচনামূলক প্রত্যাশা নিয়ে। কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন নারীর জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণ, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ—এসব উদ্যোগ নারীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করতে পারে। তবে এসব সংস্কার কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বাস্তব প্রয়োগই হবে আসল পরীক্ষা।
‘হ্যাঁ’ না ‘না’: সিদ্ধান্তের দায় নাগরিকের : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংস্কারের পথ খুলবে, তবে সেটি কোনো ম্যাজিক নয়। আবার ‘না’ জয়ী হলে সংস্কার চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে—এমনও নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘হ্যাঁ’ একটি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে, আর ‘না’ সেই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করবে। রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একক দলের প্রকল্প নয়; এটি নাগরিকদের যৌথ চুক্তি। তাই ভোট দেওয়ার আগে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আবেগ নয়—বিবেচনা। গুজব নয়—যুক্তি।
পরিশেষে বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে যে সিদ্ধান্ত উপস্থিত—তা কেবল একটি ব্যালট পেপারে সিল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক স্বাক্ষর। এটি সেই মুহূর্ত, যখন ইতিহাস আমাদের কাছে প্রশ্ন রাখে—আমরা কি শুধু দর্শক হয়ে থাকব, নাকি দায়িত্বশীল অংশীদার হব?
গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে বোঝা, ভাবা এবং বিবেকের আলোকে ভোট দেওয়া। জুলাই জাতীয় সনদ নিখুঁত নয়—এ কথা স্বীকার করাই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয়। কিন্তু এটিই প্রথম এমন একটি দলিল, যা রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ মানে সেই দরজাটি খোলা রাখা—আলোচনার, সংশোধনের ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। ‘হ্যাঁ’ মানে স্থবিরতা নয়, বরং অগ্রগতির সাহসী স্বীকৃতি। আজ তাই সিদ্ধান্তের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই? এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা প্রশ্নাতীত থেকে যাবে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে? এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল আর ব্যক্তি শক্তিশালী, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিষ্ঠানই হবে জনগণের নিরাপত্তার মূল ভরসা? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’-এর প্রকৃত অর্থ। আর এই উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই—ভয় বা গুজবে নয়, বরং যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে। কারণ রাষ্ট্র বদলাতে পারে এক দিনে, কিন্তু সমাজ বদলায় সচেতন নাগরিকের ধারাবাহিক অংশগ্রহণে। সেই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ শুরু হয় একটি দায়িত্বশীল, চিন্তাশীল ও সাহসী ভোট থেকে। ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দেওয়া একটি ভোট মানে নিখুঁত ব্যবস্থার দাবি নয়; বরং একটি উন্নত, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার পথে অগ্রসর হওয়ার অঙ্গীকার। একজন নারী নাগরিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি—এই সিদ্ধান্ত কেবল রাজনীতির নয়, এটি আমাদের জীবন, আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই সিদ্ধান্ত হোক যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে। কারণ রাষ্ট্র বদলালে বদলায় আমাদের জীবনও—আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হোক ‘হ্যাঁ’ বলে এগিয়ে যাওয়ার সাহস থেকে।





