1. admin@jagratakhobor.com : admin-ferdous :
দুমুঠো ভাতের লড়াইয়ে বন্দি এক নগর - জাগ্রত খবর - jagrata Khobor
১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| বৃহস্পতিবার| সকাল ৮:৫০|

দুমুঠো ভাতের লড়াইয়ে বন্দি এক নগর

প্রতিনিধির নাম
  • প্রকাশিত সময় বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ১৫৬ বার পড়েছেন
বিশেষ প্রতিবেদক:: বরিশাল নগরীর পূর্বে পাশে কাউয়ার চর খেয়াঘাট। খেয়া পেরিয়ে পশ্চিম দিকে তাকালে চোখ পরে ভিন্ন এক নগরের। নাম তার হিরন নগর; নামের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সেখানে নগর আছে, কিন্তু নাগরিক সুবিধা নেই। নেই নগরের স্বাচ্ছন্দ্য; আছে মানুষ, নেই মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার। নগরের বাসিন্দারা সবাই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত, দু’মুঠো ভাত যোগাড় করতে ক্লান্ত।পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। কীর্তনখোলার স্বচ্ছ জলে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে। কীর্তনখোলার মৃদু ঠেউয়ে দোলে দোলে খেয়া পার হওয়ার মুহূর্তটুকু ছিল দারুণ উপভোগ্য। কিন্তু সেই মনভোলানো আনন্দ মুহুর্তেই ম্লান হয়ে গেল। সড়ক ধরে একটু হেঁটে নগরের কাছাকাছি আসতেই এক ধরনের ভটকা গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। যত সামনে এগোই, ততই স্পষ্ট হয়; এ নগর সৌন্দর্যের নয়, অন্ধকার নগর, মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এখানকার নাগরিকরা।নগরে ঢুকতেই চোখে পড়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ভাঙাচোরা ঘর। দালান তো দূরের কথা, ভালো টিনের ঘরও দুর্লভ। সরকারের দেওয়া পাকা ঘরগুলোরও নাজেহাল অবস্থা। বাঁশ-কাঠের খুঁটি, ফুটো টিনের চালা;যার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢোকে, শিশির ঢোকে, ঢোকে হাহাকার। কোনো কোনো ঘরের বেড়া কাগজের চটের। আবার কেউ তাও জোগাড় করতে না পেরে পুরোনো সিমেন্টের বস্তা সেলাই করে বেড়া দিয়েছেন। বেড়ার সেই ছেঁড়া-ফুটো কাগজ লজ্জা ঢাকতে অনেকটাই অক্ষম।এখানকার বাসিন্দাদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০১২ সালে দরজাসহ দুই শতাংশ জমি দিয়েছিল সরকার। বর্তমানে পরিবারে লোকসংখ্যা বেড়েছে, এক পরিবার ৩পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি জমি, পরিবর্তন হয়নি তাদের ভাগ্যের। অর্থনৈতিক দুরবস্থা আর অভাব-অনটন‌ লেগে আছে এখানকার প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে।কথা হয় নগরের বাসিন্দাদের সাথে। জানান তাদের করুন-দুর্দশার কাহিনী ও জীবনের নির্মম গল্প। ৪০ বছর বয়সী নার্গিস বেগমের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় ভোর ৬টায় শেষ হয় গভীর রাতে। ক্লান্ত চোখে তিনি বলেন,”ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে বাসার কাজ-কাম শুরু করি। এরপর ৮ টায় খেয়া পার হয়ে ওপার (বরিশাল শহর) যাই। খেয়াঘাট থেকে আধা ঘন্টা হেটে মুন্সিগ্রেজের ওখানে যে বাসায় কাজ করি সেখানে পোছাই। সেখান থেকে কাজ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ৩টা-৪টা বেজে যায়। এসে বিকালে আবার এখানে ভাপা পিঠা বেচি (বিক্রয় করি)। তারপর রান্না করতে করতে শীতকালে রাত ১১টা বেজে যায় গরমে আরো বেশি।এই দীর্ঘ খাটুনির পরও তার স্বস্তি নেই, ঘরে নেই শান্তি । স্বামী কাজ করেন বিল্ডিং ভাঙার শ্রমিক হিসেবে;সপ্তাহে এক-দুই দিন কাজ জোটে। অথচ সেই কষ্টার্জিত টাকায় ১৯ বছরের বড় ছেলে নেশায় ডুবে আছে। টাকা না পেলে ভাঙচুর করে ঘর-দুয়ার (দরজা)।নার্গিসের পানি টলটল করা চোখে তখন শুধু অসহায়ত্ব।অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটান ৪২ বছর বয়সী হাসান শিকদারের ৫ সদস্যের পরিবার। ভাড়া করা রিকশা চালক হাসান বলেন, ডেইলি ছয়-শাতশো টাকা কামাই (আয়) করি। এর মাঝে গ্যারেজে দিতে হয় ৪০০ টাকা । ৭০ বছর বয়সী বিছানায় পড়া মা-কে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারি না, ঔষধ খাওয়াতে পারি না। মাছ-গোশত কী খামু! ঠিকমতো নুন মরিচ দিয়া ভাতই খাইতে পারি না! কুরবানীতে মানুষ গোশত দিলে একটু খাই,না দিলে নাই। অবরোধের সময় ইউএনও দইডা ঝাটকা মাছ দিছিলো‌। বড় পোলা (ছেলে) মাদ্রাসায় মোটামুটি ফ্রিতে মাদ্রাসায় পড়াই, প্রাইভেট পড়াইতে পারি না।২০১২ সালে বরিশাল শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটারখাল বস্তির বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করা হয় সদর উপজেলার চর কাউয়ারে। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ এই কলোনির নাম দেন হিরণ নগর। আজ এখানে প্রায় ৩০০ পরিবারে আনুমানিক দুই হাজার মানুষের বসবাস। সবাই দিন আনে, দিন খায়। সরকারের দেওয়া সেই ২ শতাংশ জমিতে টোঙের মতো ছোট একটি ঘর ছাড়া ফসল চাষ কিংবা গবাদি পশু পালন তো দূরের কথা হাঁস-মুরগি পালনও সম্ভব না।এখানকার বাসিন্দাদের মতে, তাদের জীবনের প্রধান সমস্যা;মাদকাসক্তি ও কর্মসংস্থানের অভাব। নিরাপদ পানির সংকট,পয়ঃনিষ্কাশনের দুরবস্থা, খেলার মাঠ ও সুস্থ বিনোদনের কোনো সুযোগ না থাকা তাদের জীবনকে আরো দুরোহ করে তুলেছে। নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা হওয়ায় জোয়ারের পানিতে প্রায়ই তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা, নারীদের প্রশিক্ষণ ও টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।রেহেলা বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ঘরে তার দুই বিবাহযোগ্যা মেয়ে, তাই দূরে কোথাও কাজে যেতে পারেন না। কাঁপা গলায় তিনি বলেন,“দেড়-দুই মাস ধইরা ওই ঘরের ভাবিরা খাওয়ায়। হেগোও অবস্থাও ভালো না,দিন আনে দিন খায়। এমনে আর কয়দিন চলবে জানি না।”চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “মাইয়াগোর বিয়া দিতে পারি না। সন্ধ্যা হইলে নেশাখোরদের উৎপাত বাড়ে। ঘরেও ঠিকমতো থাকি পারি না। ওই দ্যাহেন, গাঁজার আগুন দিয়া পায়খানার বেড়া পুইড়া ফেলাইছে বদমাইশগুলা। ঘরের পাশে বইসা সিগারেট, গাঁজা, বাবা খায়; কিছু কইলে উল্টো ধমকানি দেয়, গালি দেয়, ঘর দুয়ার পিটায়। ওই ঘরের ভাবি কত কষ্ট করে দুইডা মুরা(মুরগি) পালছিল, ওরা রাতে ঘর থেকে চুরি কইরা নিয়া গেছে।২০২২ সালে সিডিপি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার দিক থেকে এখানকার বাসিন্দারা যথেষ্ট পিছিয়ে। ১৭দশমিক ১ শতাংশ বাসিন্দা নিরক্ষর। ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ খানাপ্রধানের পেশা দিনমজুরি। তাঁদের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভূমিহীন। ভবিষ্যতে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ খানার যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত, ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ খানার স্বাস্থ্যহানি, ৯২ শতাংশ খানার নিরাপদ পানিপ্রাপ্তি ও ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ খানার জীবিকার উৎস হারানোর আশঙ্কা করা হয় গবেষণার ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে।সিডিপির বরিশাল অঞ্চলের সমন্বয়ক আ.জ.ম রাশেদ জানান, ২০২২ সালের পর আমাদের এ নিয়ে পুনরায় গবেষণা হয়নি। তবে আমাদের পর্বেক্ষণ হচ্ছে, অবস্থার উন্নতি হয়নি; বরং এসব এলাকার মানুষের দুর্দশা বেড়েছে।হিরন নগরের বাসিন্দাদের মানবেতর জীবনের কষ্টগাথা শুনতে বেলা গড়িয়ে এলো। মিন্টু, রহিমা, শাহানাজ;একেকটি নাম, একেকটি দীর্ঘ কষ্টের উপাখ্যান। হঠাৎ টের পাই, কিছু মাদকাসক্ত আমাদের অনুসরণ করছে, আর চোখ তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমরা দ্রুত পায়ে সেখানে থেকে সরে আসি। ফের খেয়া নৌকায় বসে দেখলাম পশ্চিম আকাশের লাল আভা প্রায় মুছে গেছে, মুছেনি হিরণ নগরের বাসিন্দাদের দুঃখ। শান্ত নদী যেমন নীরবে বয়ে চলে, তেমনি কীর্তনখোলার তীরের এই নগরের মানুষও দিনের পর দিন নীরবে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা।

নিউজটি ফেসবুকে শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর
রমজান সময়সূচি

আজ ৩০ রমজান

সেহরির শেষ: --

ইফতার শুরু: --

.

Developed by Barishal Host

© All rights reserved © 2025 Jagratakhobor.com