মোঃ ফেরদাউস::একটি গল্প আছে এক মহিলার দু’ছেলে। মা একদিন ধোয়ামোছার কাজে পুকুরঘাটে যাচ্ছেন। বড় ছেলেকে বললেন, ছোট ছেলের দিকে খেয়াল রাখতে। ছোট ছেলে হামাগুঁড়ি দিয়ে চলছিল, হঠাৎ একটি পোকা সামনে পেয়ে মুখে পুরে গিলে ফেলল। বড় ছেলে কী করবে বুঝতে পারছিল না। শত্রু পক্ষের একটি লোক বড় ছেলেকে এসে বলল, তোমার ভাই পোকা খেয়ে ফেলেছে। তোমার ভাইকে পোকা মারার ওষুধ খাইয়ে দাও। ছেলেটি তাই করল। মা এসে দেখলেন ছোট ছেলেটি ছটফট করছে। মা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? বড় ছেলে বলল, মা তুমি কিচ্ছু ভেবো না। সে পোকা খেয়েছে, আমি পোকাটি মারার জন্য তাকে পোকামারার ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি। শিশুটি ভেবেছে সে তার ছোট ভাইয়ের উপকার করেছে, কিন্তু এতে যে তার জীবন সংশয় হবে বুঝতে পারেনি। ঠিক তেমনি কিছু লোক ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের আশ্রয় নিচ্ছে। তারা ভাবছে তারা ইসলামের উপকার করছে, বাস্তবে তারা ইসলামের ক্ষতি করছে অথচ বুঝতে পারছে না। তারা হয়তো আন্তর্জাতিক ইসলামবিরোধী চক্রের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছে, তা বুঝতে পারছে না।ইসলাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না। এ বিষয়ে কোরান ও হাদিস থেকে জ্ঞানার্জন করতে হবে। ইসলাম প্রচারের ও ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিগুলো জানতে হবে। জিহাদ কী? কীভাবে কোন পদ্ধতিতে জিহাদ করতে হয়? জিহাদ এবং ইরহাবের (সন্ত্রাস) পার্থক্য বুঝতে হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে সংক্ষেপে কোরান ও হাদিসের আলোকে সংক্ষেপে আলোচনা করা যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মোমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করবে তার শাস্তি হলো জাহান্নাম, সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত, তার ওপর আল্লাহর অভিশম্পাত এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে (সূরা নিসা, আয়াত-৯৩)। আল্লাহ আরো বলেন, কোনো মোমিন কোনোভাবেই ভুলক্রমে ছাড়া কোনো মোমিনকে হত্যা করতে পারে না (সূরা নিসা, আয়াত-৯২)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরানের সূরা মায়িদার ৩২নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে নিহতের বদলা বা সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণে শাস্তি ব্যতীত হত্যা করল সে যেন সব মানব জাতিকে হত্যা করল, আর যে মানুষকে বেঁচে থাকতে দিল সে যেন সব মানুষকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। আত্মঘাতী হামলা বিষয়ে ঘোষণা করা হয়েছে, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিও না, উত্তম কাজ কর, আল্লাহ উত্তম ব্যবহারকারীদের ভালোবাসেন (সূরা বাকারা-১৯৫)। আল্লাহপাক আরো বলেন, তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি কর না, নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না (কাছাছ-৭৭)। আল্লাহ বলেন, তোমরা সেসব অপরাধীর আদেশ মান্য করবে না যারা পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, সংশোধনমূলক কিছু করে না (সূরা শুয়ারা-১৫১)। নবী (সা.) বলেছেন, দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকেও আল্লাহর নিকট গুরুতর অপরাধ হলো কোনো মুসলিমকে হত্যা করা (তিরমিজি)। নবী (সা.) বলেন, মুসলমান সে ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাতের অনিষ্ট থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ। মুহাজির সে ব্যক্তি যে আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে (বুখারী)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মামউদ (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেনÑকোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি অর্থাৎ কবিরাহ গুনাহ আর কোনো মুসলমানকে হত্যা করা কুফরি (মুসলিম)। নবী (সা.) বলেছেন, সকল সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার। যে আল্লাহর পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালো ব্যবহার করে আল্লাহ তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। এভাবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মানুষ হত্যার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ফেতনা ফ্যাসাদ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির শাস্তির ঘোষণা এবং এগুলো থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়েছে। বাস্তব জীবনেও নবী (সা.) এর উদাহরণ হয়ে রয়েছেন। যেমনÑতায়েফে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে যখন মহানবী (সা.) পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হলেন, জিবরাইল (আ.) নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আপনি শুধু অনুমতি দিন পাহাড় দিয়ে চেপে তায়েফের অধিবাসীদের ধ্বংস করে দিই। নবী (সা.) বললেন, মানুষ ধ্বংস হয়ে গেলে কাদের নিকট আমি দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করব? নবীজী অনুমতি দিলেন না। মাতৃভূমি থেকে মক্কার কাফিররা নবী (সা.)কে নির্যাতন করে বিতাড়িত করে। নবীজী জন্মভূমি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। যেদিন মক্কা বিজয় হলো নবী (সা.) প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সবাইকে ক্ষমা করে দেন। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম অন্যায় হত্যার সূচনা করে আদম (আ.) পুত্র কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যার মাধ্যমে। আর তাই পৃথিবীতে যত অন্যায়ভাবে হত্যা হবে তার প্রতিটির একটি পাপ তার ওপর পড়বে। হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে অর্ধ পৃথিবী মুসলমানদের অধিকারে আসে। যদি তলোয়ার দিয়ে কাউকে ধর্মান্তরিত করার বিধান থাকত তাহলে এ অর্ধ পৃথিবীতে কোনো অমুসলিম খুঁজে পাওয়া যেত না। দীর্ঘকাল এ ভারতীয় উপমহাদেশ মুসলিম শাসকদের অধীনে শাসিত হয়। সৈন্যবাহিনীসহ সব ছিল মুসলিম শাসকের অধীন। হত্যা, বিশৃঙ্খলা ও জোর করে ধর্মান্তরিত করার বিধান থাকলে এ ভারতীয় উপমহাদেশে অন্য ধর্মাবলম্বীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেত না। ইসলাম প্রচার হয়েছে নৈতিক আদর্শ দিয়ে। গায়ের জোরে প্রচার হলে মনের দিক থেকে কেউ আদর্শ মেনে নিত না। আর বুঝেশুনে মনের দিক থেকে মেনে না নিলে তা কখনো স্থায়ী হতো না। ইসলামের শত্রুরা শিয়া, সুন্নি ইত্যাদি গোত্রীয় বিরোধ, মাযহাবী-লা-মাযহাবী ইত্যাদি মতাদর্শগত বিরোধ লাগিয়ে মুসলমানদের দিয়ে মুসলমানদের বিনাশ করার চেষ্টা করছে ও ইসলামকে সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তাই আমাদের ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের সন্তানদের ভুল বুঝিয়ে কেউ যেন বিপদগামী করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।