জাগ্রত নিউজ::বরিশাল সদর উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসন ও মৃতপ্রায় খাল পুনঃখননের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ নির্ধারিত সময়ে কাজে লাগাতে পারেনি উপজেলা প্রশাসন। একটি প্রকল্পের পুরো বরাদ্দ এবং অপর প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত খাল পুনঃখনন না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন মহল।সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)’-এর অধীনে বরিশাল সদর উপজেলায় দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের জন্য মোট ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘মরখখোলার পোল হইতে ঝড়ঝড়িয়াতলা বাজার হইয়া মাঝি বাড়ির ব্রিজ পর্যন্ত’ ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৩২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পটির কোনো কাজ বাস্তবায়ন না করেই পুরো অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত পাঠিয়েছেন বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফরিদা সুলতানা।অপরদিকে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের কীর্তনখোলা নদীর পাড় (মহাবাজ) হইতে মাতাসার ব্রিজ হইয়া রায়ের খাল পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ প্রকল্পে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৮৪৬ টাকা ব্যয় দেখিয়ে অবশিষ্ট ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৯৯৬ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। মরখখোলারপুল এলাকার বাসিন্দা রুবেল হাওলাদার বলেন, “এই খালটি পুনঃখননের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছেন। অবশেষে সরকার খাল খননের জন্য বরাদ্দ দিলেও সেই কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। এতে আমরা খুবই হতাশ। খালটি খনন হলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হতো, জলাবদ্ধতা কমত এবং এলাকার কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ সবাই উপকৃত হতেন।কাশিপুর আরআরএফ পুলিশ লাইন সংলগ্ন বিল্লাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বাবুল বলেন, একসময় লাকুটিয়ার এই খাল ছিল আমাদের জীবিকার অন্যতম উৎস। ছোটবেলায় এই খাল থেকে মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা মেটাতাম। কিন্তু বছরের পর বছর খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। সরকার যখন খাল পুনঃখননের জন্য টাকা বরাদ্দ দিল, তখন আশা করেছিলাম খালটি আবার আগের রূপ ফিরে পাবে। কিন্তু কাজ না হওয়ায় সেই আশাও শেষ হয়ে গেছে।আবহাওয়া অফিস সংলগ্ন বাঘিয়া এলাকার বাসিন্দা মিজান সরদার বলেন, “বর্ষা এলেই খাল ভরাট থাকায় আমাদের এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে পানি ওঠে। খালটি খনন হলে অনেক দুর্ভোগ কমে যেত। কিন্তু সেই সুযোগটাও হারিয়ে গেল।” “সরকার মানুষের সুবিধার জন্য টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সেই টাকা কাজে লাগানো না গেলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলো না, সেটির জবাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া উচিত।” কৃষক ছত্তার বলেন, লাকুটিয়া খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচ ও পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। বর্ষায় জমিতে পানি জমে ফসলের ক্ষতি হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেয়। খাল পুনঃখনন হলে কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হতেন। এখন আমরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলাম।স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খালগুলো ভরাট হয়ে থাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন সংকট এবং কৃষিকাজে দুর্ভোগ বেড়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ও নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এসব খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় উন্নয়নের সেই সুযোগ হারিয়েছে সদর উপজেলা।সচেতন মহলের মতে, সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরও তা সময়মতো বাস্তবায়ন করতে না পারা প্রশাসনিক পরিকল্পনা, সমন্বয় ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাদের দাবি, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পানি প্রবাহ সচল হওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।স্থানীয়দের প্রশ্ন, যখন একই কর্মসূচির আওতায় জেলার অন্যান্য উপজেলায় খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তখন বরিশাল সদর উপজেলায় কেন তা সম্ভব হলো না? প্রকল্প বাস্তবায়নে কী বাধা ছিল, কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং এর দায়ভার কে নেবে এসব প্রশ্নের জবাব জানতে চান তারা।বরিশাল সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বরিশাল বাণীকে বলেন, ঐ খালে গার্বেজ বেশি, দুই পাশে অনেক বাড়িঘর। এসব নানাবিধ কারনে কাজ করা সম্ভব হয়নি।বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফরিদা সুলতানা ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বরিশাল বাণীকে বলেন, আমি রয়েছি রুটিন দায়িত্বে। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারছিনা।বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার বরিশাল বাণীকে বলেন, আমি ৫ জুলাই বরিশালে যোগদান করেছি। আমার যোগদানের আগেই খাল পুনঃখনন প্রকল্পের বরাদ্দ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সদর উপজেলায় কেন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।