
নিজস্ব প্রতিবেদক::বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলায় মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সাড়ে চার লাখের বেশি জেলে। তারা বলছেন, সরকার চাল দিলেও তা দিয়ে সংসার চলে না। ঋণের কিস্তি, দাদন আর অভাবের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তাই খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি নগদ অর্থ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া চরের জেলে আলী হোসেনের সংসারে ৬ জন সদস্য। তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম। তিনি বলেন, “প্রতিদিন আড়াই কেজি চাল লাগে। সরকার যে চাল দেয়, তা ২৫ কেজি হলেও হাতে আসে ২০ কেজি। এতে ৮-১০ দিনও চলে না। তাও কখন চাল পাব, তা-ও জানি না। বাধ্য হয়ে অনেকে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মাছ ধরতে যায়।টুমচরের জেলে খালেক বেপারী বলেন, “এবার মাছই পাইনি, দাদন শোধ করতে পারিনি। শোধ না করলে আগামী মৌসুমে দাদন পাব না। এখন নিষেধাজ্ঞায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।ভোলার ইলিশা এলাকার জেলে লোকমান হোসেন বলেন, “মাছ ধরা বন্ধ, নৌকা আর জাল তীরে এনেছি। এখনো চাল হাতে পাইনি।বরগুনার জেলে আব্দুর রব বলেন, “আবহাওয়ার জন্য এবার মাছ কম পেয়েছি। এখন আবার ২২ দিনের অবরোধ। কিস্তি দিতে হচ্ছে দেনা করে।তিন বছর চাল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন বরগুনার রফিকুল নামে এক জেলে। বলেন, “কার্ডে নাম থাকলেও চাল দিচ্ছে না। মেম্বারকে বলেও লাভ হয়নি।বরিশাল বিভাগে মোট নিবন্ধিত জেলে ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে চাল পাচ্ছেন ৩ লাখ ৪০ হাজার জন। প্রতি জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। চাল বিতরণ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য উপ-পরিচালক কামরুল হাসান জানান, “পিরোজপুর ও মঠবাড়িয়ায় চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। অন্যান্য জেলাতেও দ্রুত চাল পৌঁছাবে। নগদ অর্থের দাবি যৌক্তিক, তবে তা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। লিখিতভাবে জানালে বিবেচনা করা হতে পারে।২০০৮ সাল থেকে আশ্বিন মাসে মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা চালু হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ইলিশ পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় ডিম ছাড়ে। তাই এখন ২২ দিন মাছ ধরা, পরিবহন, বিক্রি, মজুদ ও বাজারজাতকরণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ।চলতি বছর ৪ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা চলছে। আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা জরিমানা হতে পারে।জেলেরা বলছেন, শুধুই নিষেধাজ্ঞা নয়, তাদের জীবিকার দিকেও নজর দিতে হবে।পাথরঘাটা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “চাল দিয়ে সংসার চলে না। নগদ অর্থও দিতে হবে। না হলে ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ সফল হবে না।”জেলে জলিল মাঝি বলেন, অবরোধে আমরাই মাছ ধরতে পারি না, অথচ ভারতীয় জেলেরা ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যায়। সরকার যেন এ বিষয়ে কঠোর হয়।জেলেরা বলছেন, তারা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে চান। কিন্তু সরকার থেকে পর্যাপ্ত ও সময়মতো সহায়তা না পেলে তারা বাধ্য হয়ে আবার নদীতে নামবেন। তাই খাদ্য সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছানো ও নগদ অর্থ প্রণোদনা এখন সময়ের দাবি। না হলে মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগে ভর করতে পারে হতাশা।