জাগ্রত নিউজ::রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের বিরিয়ানি খেতে এবং তাঁদের পাহারায় অস্ত্র হাতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর দাবি, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ‘পাখির মতো’ গুলি চালানো হয়। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। মোহাম্মদপুরে নয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের অষ্টম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন মামুন ফরাজি। ৩১ বছর বয়সি মামুন পিরোজপুরের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।জবানবন্দিতে মামুন বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার দৃশ্য সমাজমাধ্যমে দেখে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮ জুলাই আছরের নামাজের পর মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের কাছে ময়ূর ভিলার সামনে আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখেন। আহতদের রিকশা ও বিভিন্ন যানবাহনে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পর দিন শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অস্ত্র নিয়ে মহড়া এবং পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যদের গুলি চালাতে দেখেছেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন মামুন। পরে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়ে তিনি দেখেন, পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা বসে বিরিয়ানি খাচ্ছেন। আর অস্ত্র হাতে তাঁদের পাহারা দিচ্ছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।জুমার নামাজের পর বাঁশবাড়ি এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিলে দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা একযোগে গুলি চালান বলে দাবি করেন তিনি। গুলির মুখে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন গলি ও ভবনে আশ্রয় নেন। এ সময় ওরিয়েন্টাল কোভান আবাসিক ভবনের গেটে আশ্রয় নেওয়া রাজু নামের এক আন্দোলনকারীকে পুলিশ ও আনসার সদস্য টেনে নিয়ে গুলি করেন বলেও সাক্ষ্য দেন মামুন। তাঁর দাবি, আনসার সদস্য ওমর ফারুক রাজুকে গুলি করেন। আহত রাজুর পায়ে ও পেটে গুলি লাগে। হাসপাতালে নেওয়ার পর সেদিনই তিনি মারা যান।ওই দিন বিকালে বছিলা তিন রাস্তার মোড়েও পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতা-কর্মীদের গুলি চালাতে দেখেছেন বলে জানান মামুন। তাঁর দাবি, হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হয়। সন্ধ্যায় গুলির তীব্রতা বাড়লে মেহজাবিন বিউটি পার্লারের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির আড়ালে আশ্রয় নেন তিনি। সেখান থেকে জসিম নামের এক আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় জসিম মারা যান বলে সাক্ষ্যে জানান তিনি। ২২ জুলাই মোহাম্মদপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচে টিয়ারশেলের আঘাতে নিজেও আহত হন মামুন। এরপর আর আন্দোলনে অংশ নেননি।জবানবন্দির শেষাংশে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ ও সহযোগিতায় হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে। তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন চারজন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি।