তবে রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সিংহাভাগই নিজেদের বলে দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানটির সরকারি অনুমোদন নেই। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো কর্তৃক অনুমোদিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় নেই এফসি রিক্রুটমেন্ট-এর নাম। এ ছাড়া তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এফসি সেন্টারেরও কোনো অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদন না থাকায় ভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠানো হয়।
জানা গেছে, চলতি বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়ে অন্তত অর্ধডজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের গ্রামের আকরাম হোসেন, ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ইয়াসিন মিয়া শেখ, নাটোরের সিংড়ার হুমায়ুন কবীর ও রাজবাড়ীর অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য নজরুল ইসলাম। এ ছাড়া রাশিয়া প্রবাসী অনেক বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্বজনরা দাবি করেছেন।
এসব ব্যাপারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বলছে, মস্কোর শপিং মলে সেলসম্যান, সিকিউরিটি গার্ড, রেস্টুরেন্টে শেফসহ বিভিন্ন পদে মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের রাশিয়া নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দুই-তিন বছর চাকরি করার পর নাগরিকত্ব প্রদানসহ বাবা-মা, ভাই-বোনকেও রাশিয়ার নাগরিকত্ব প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রলোভনে পড়ে শত শত বাংলাদেশি তরুণ-যুবক দুবাই, সৌদি আরব অথবা তুরস্ক হয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন রাশিয়ার রাজধানী মস্কো। এক-দুই সপ্তাহ পর তাদের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর বাইরে জনমানবহীন এলাকায় অবস্থিত রাশিয়ার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। তাদের বলা হয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে মাসে ৪ লাখ রুবল পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। প্রাপ্ত রুবল বাংলাদেশেও রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠাতে পারবে। প্রস্তাবে রাজি না হলে এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তাও বন্ধ। অগত্যা জীবনের মায়া ত্যাগ করে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন তারা।
ভুক্তভোগী আকরামের বাবা মোরশেদ মিয়া বলেন, আমরা আত্মীয়দের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ধার করে আকরামকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। আকরাম একটি চীনা কোম্পানিতে ছয় মাস ধরে ওয়েল্ডার হিসেবে কাজ করছিল। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষে আকরামকে ‘চুক্তিবদ্ধ যোদ্ধা’ হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। ১৫ দিনের মৌলিক প্রশিক্ষণের পর আকরামকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। গত ১৪ ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় সে নিহত হয়।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের ভিডিও। এসব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তরুণরা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করছে; জঙ্গল বা ফাঁকা গম খেতের মধ্যে তারা বাংকার খনন করছে; রাস্তায় পড়ে আছে ট্যাংক, সাঁজোয়া যানবাহন, এপিসি, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানসহ যুদ্ধের শত শত সরঞ্জাম; আবার মেশিনগান থেকে শত্রুপক্ষের দিকে মুহুর্মুহু গুলি করা হচ্ছে; এখানে ওখানে পড়ে আছে ভূপাতিত ড্রোন। আবার অনেকেই ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছেন।
এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে মানব পাচারের ঘটনা সংঘটিত হলেও যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এভাবে মানব পাচার আগে ঘটেনি। টাকার লোভে পড়েই মূলত মানুষ এ ফাঁদে পা দিচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ওপর পড়ছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রচার কিংবা সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং সরকার রাশিয়ায় লোক পাঠানোর অনুমতি প্রদান করছে। এ মুহূর্তে সরকারের উচিত রাশিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া বন্ধ করা। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা।



