
ফরিদপুর প্রতিনিধি::লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের হাতে নির্যাতনে গত বছর (২০২৫) প্রাণ হারিয়েছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গার হাবি মাতুব্বর। ৩০ লাখ টাকা দিয়েও তাকে বাঁচানো যায়নি। এ ঘটনায় তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম বাদী হয়ে ফরিদপুর মানবপাচার দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসকে আদালত নির্দেশ দেন। পরে মুক্তিপণ নেওয়া ব্যক্তিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন বাদী।নিহত হাবি ভাঙ্গার জাঙ্গালপাশা গ্রামের মৃত আবদুস সালাম মাতুব্বরের ছেলে। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। প্রবাসে স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাসলিমা।পরিবারটি জানায়, স্থানীয় মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য ও পার্শ্ববর্তী গোয়ালপাড়া গ্রামের আসলাম মাতুব্বরের সঙ্গে পরিচয় হয় হাবির। তাকে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চক্রের প্রধান মাফিয়া নগরকান্দা উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের মুরাদ ব্যাপারী ও তার সহযোগী ফুলসুতি গ্রামের বকুল মাতুব্বরসহ ছয়জনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আসলাম। পরে ২০ লাখ টাকায় ইতালি যাওয়ার চুক্তি হয়। ধারদেনা ও জমি বন্ধক রেখে প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা চক্রটির হাতে দেন হাবি। এরপর ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট ইতালির উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। লিবিয়ায় পৌঁছার পর ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা বকুলসহ তিনজনের হাতে দেওয়া হয়।বন্দিদের সঙ্গে হাবিকে একটি বদ্ধঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালাতে থাকে চক্রটি। সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে পাঠানো হয় বকুলের কাছে এবং হাবির স্ত্রীকে দেখান বকুল। হাবিকে বাঁচানোর জন্য আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। নিজেদের বসবাসের ঘর বন্ধক রেখে, স্বজনদের থেকে ধার ও সুদে ১০ লাখ টাকা জোগাড় করে দালালদের দেয় পরিবারটি।তাসলিমা জানান, মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও নির্যাতন থামেনি। এক মাস পর বকুলের মাধ্যমে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে মুরাদ। ওই টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নির্যাতন বাড়তে থাকে এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অপর বন্দিদের মাধ্যমে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পান তিনি। হাবির মৃত্যুর ঘটনায় সেখান থেকে জানালা ভেঙে অন্তত ১১ জন আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার মাধ্যমে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন।এ ঘটনায় ১৪ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন তাসলিমা। মামলায় ২৬ অক্টোবর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক ষষ্ঠীপদ রায়। ওই প্রতিবেদনে ‘তিন নম্বর আসামি হিসেবে বকুল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি’ বলে উল্লেখ করা হয়।এ বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তাসলিমা বলেন, পাওনাদারদের ভয়ে তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, কখনো না খেয়েও থাকছি। বকুল নিজেই আমার বাড়িতে এসে টাকাগুলো নিয়েছে, তাকেই শুরুতে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাহলে আমি বিচার পাব কোথায়? আমার স্বামী হত্যার সঠিক বিচার চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে বাঁচতে চাই।বিষয়টি নিয়ে জানতে বকুলের মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের কর্মকর্তা ষষ্ঠীপদ রায় বলেন, মামলার বাদী তাসলিমা বকুলের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। প্রমাণ ছাড়া একজনকে অভিযুক্ত করা যায় না।