অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, ফেরি খরচ, গ্যারেজ, টুলস, মাইলেজ, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থের অপচয় ও আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে ৪৩০ পাতারও বেশি নথি ও তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমান চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, বিভিন্ন খাতে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন করে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে বিভিন্ন হিসাবের অনিয়মসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর কয়েকজন কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. কামরুজ্জামান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেন। অভিযোগকারী এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুদকের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মো. কামরুজ্জামান ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ডিপোতে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিআরটিসির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।
চেয়ারম্যানকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাকে ঘিরেও বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একটি সূত্রের দাবি, ডিপো ও বিভিন্ন ইউনিটের ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সূত্রটি দাবি করেছে, মাসিক হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয় এবং অর্থ দিতে অনীহা প্রকাশ করলে পদ হারানোর ভয় দেখানো হয়।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একই সূত্রের দাবি, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমেও অনিয়ম করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে গত বছরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার অপারেটিং ব্যয়ের জন্য ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বর্তমান চেয়ারম্যান ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। সূত্রটির আরও দাবি, চেয়ারম্যানের কক্ষের ডেকোরেশনের জন্য ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং ভাউচারের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিষয়ে বিআরটিসির অনুমোদিত বাজেট, ব্যয়ের ভাউচার এবং অডিট প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
পুরনো সিন্ডিকেট বহাল থাকার অভিযোগ
বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ে পুরনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন ডিপোতে পুরনো লিজ, কাউন্টার ও ব্যবস্থাপনা বহাল থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন। এতে পদায়ন, আর্থিক বরাদ্দ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিসির আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
টিআইবির সতর্কতা
পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
টিআইবির বক্তব্য অনুযায়ী, যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কিংবা পদায়ন করা হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ায়। পরিবহন খাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়মের বিষয়েও টিআইবি বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলে শুধু ব্যক্তিকে দায়ী না করে পুরো ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অডিট, পদায়ন, টেন্ডার, জ্বালানি ব্যয়, রাজস্ব আদায় ও নগদ অর্থ উত্তোলনের হিসাবও স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
জবাবদিহিতার দাবি
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে তিন বছরে ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি অনিয়মের অভিযোগ এবং বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের মতে, দুদক ও বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তি এবং অর্থের গতিপথ চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম ও হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।







